green banking in sbl

সুজলা সুফলা শস্য-শ্যামলা আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে ‘‘পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন’’ ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে। এ আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ হলো গ্রিন ব্যাংকিং তথা পরিবেশ বান্ধব ব্যাংকিং কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা। পরিবেশ বিপর্যয় রোধকল্পে ও পৃথিবীকে বাঁচানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করেছে।  সামাজিক দায়বদ্ধতামূলক নীতিবোধ এবং সরকারের কর্মসূচী বাস্তবায়নকল্পে দেশের সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে সোনালী ব্যাংক লিমিটেড ইতিমধ্যে পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং কার্যক্রম অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক শক্তিশালী ও টেকসই ব্যাংক ব্যবস্থার স্বার্থে বিশ্বমানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। উক্ত নীতিমালার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী গ্রিন ব্যাংকিং কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সোনালী ব্যাংক লিমিটেড কর্তৃক গৃহীত কর্মসূচীর ধারাবাহিক বিবরণ নিমেণ তুলে ধরা হলোঃ

  গ্রিন ব্যাংকিং নীতিমালা প্রণয়নঃ পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা গ্রিন ব্যাংকিং নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য। ব্যাংকের কোন কর্মকান্ড যাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হয়ে না দাঁড়ায় তা নিশ্চিত করে অর্থায়ন ও সার্বিক কর্মকান্ড পরিচালনার মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্যে পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিং বা গ্রিন ব্যাংকিং এর উদ্দেশ্যাবলি ও মূল বিষয়াদি বিবৃত করে ‘‘গ্রিন ব্যাংকিং নীতিমালা’’ প্রণয়ন করা হয়েছে। পরিবর্তিত ব্যবসায়িক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যের লক্ষ্যে বিদ্যমান ‘‘গ্রিন ব্যাংকিং নীতিমালা (Green Banking Policy)’’ টি সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়ায় তা’ সংশোধন/পরিবর্ধন/বিয়োজন করে প্রণয়ন করে ব্যাংকের সকল অফিস/শাখায় প্রেরণ করা হয়েছে।
  ‘গ্রিন অফিস গাইড’ প্রণয়নঃ সোনালী ব্যাংক লিমিটেড এর গ্রিন ব্যাংকিং কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে In-house Environmental Management সংক্রান্ত গাইডলাইনস্/প্রয়োজনীয় সাধারণ নির্দেশনা সম্বলিত ইস্তেহার জারী করা হয়েছে। যার মাধ্যমে এ ব্যাংকের সকল অফিস এবং শাখা পর্যায়ে কাগজের ব্যবহার কমানো, পানির ব্যবহার পরিমিতকরণ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানীর মিতব্যয়িতার প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
  অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ব্যবস্থাপনার উন্নয়নঃ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন সামগ্রী ব্যবহারের ক্ষেত্রে Reduce, Reuse, Recycle এর চর্চার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব বা সাশ্রয়ী ব্যাংকিং নিশ্চিতকরণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ ব্যাংকের ৩৯টি শাখা এবং ০২ টি Automated Teller Machine (ATM) সৌর বিদ্যুৎ এর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। প্রধান কার্যালয়ের ছাদে ২০১২ সালে ১০,০০০ ওয়াট পিক সম্পন্ন সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে।
  ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় পরিবেশগত ঝুঁকি অন্তর্ভূক্তকরণঃ পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিকে ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় (CRM) অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। নতুন ঋণ মঞ্জুরী ও নবায়নের সময় প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রকল্পের    ঋণ ঝুঁকি নিরূপনের পাশাপাশি পরিবেশগত ঝুঁকি নিরূপন করা হচ্ছে। পরিবেশগত ঝুঁকি নিরূপণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণীত Guidelines On Environmental Risk Management (ERM)-এ সন্নিবেশিত Environmental Due-diligence (EDD) Checklist অনুযায়ী ব্যাংকের অর্থায়নকৃত ও অর্থায়নযোগ্য প্রকল্পের Environmental Risk Rating (EnvRR) নিরূপণ করা হচ্ছে।
  গ্রিন অর্থায়ন চালুকরণঃ শিল্প প্রকল্পে Effluent Treatment Plant (ETP) স্থাপনে অর্থায়ন, কার্বন নিঃসরণ রোধের লক্ষ্যে ইট ভাটায় Hybrid Hoffman Kiln (HHK) স্থাপন, সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন, নবায়নযোগ্য জ্বালানী প্রকল্পের প্রসার, Bio-Fertilizer Plant, Bio-Gas Plant, PET bottle, Non-fire Block Brick Manufacturing Plant, Vermicompost ইত্যাদিতে অর্থায়নের মাধ্যমে গ্রিন অর্থায়ন করা হচ্ছে। এছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত ৫২টি গ্রিন প্রোডাক্ট-এ ঋণদানের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। ২০১৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত এ ব্যাংকের প্রত্যক্ষ পরিবেশবান্ধব অর্থায়ন খাতে স্থিতি ৭.৬৯ কোটি টাকা।

সোনালী ব্যাংক লিমিটেড, রৌমারী শাখা, কুড়িগ্রাম এর অর্থায়নে স্থাপিত সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প।

  গ্রিন মার্কেটিং চালুকরণঃ পরিবেশবান্ধব পণ্য ও সেবা উদ্ভাবন, উৎপাদন, বিপণন ও বাজারজাতকরণের বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ব্যাংক কর্তৃক অর্থায়নকৃত ও অর্থায়নযোগ্য প্রকল্পে (শিল্প/ব্যবসা) পরিবেশগত দিক থেকে নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত পণ্য উৎপাদন, বিপণন, বাজারজাতকরণ সুনিশ্চিত করা হচ্ছে।
  গ্রিন শাখা স্থাপনঃ গ্রিন শাখা স্থাপনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নির্দিষ্ট Criteria পাওয়ার পর বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।
  জলবায়ু ঝুঁকি তহবিল গঠনঃ দেশের বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা, নদী ভাঙ্গনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগ কবলিত অঞ্চলের জন্য কম সুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে।  এছাড়া  পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ঝুঁকি প্রবণ বিভিন্ন এলাকার জন্য পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিংয়ের আওতায় কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) অংশ হিসেবে ‘‘জলবায়ু ঝুঁকি তহবিল (Climate Change Risk Fund))’’ গঠন করে জরুরী প্রয়োজনে সে তহবিলের অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রাকৃতিক দূর্যোগ কবলিত এলাকার উন্নয়নে ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০১৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত এ খাতে ৫.৮৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
  Online Banking চালুকরণঃ ব্যাংকের ১২১২ টি শাখায় Core Banking Solution (CBS) ও SMS Banking এর মাধ্যমে গ্রাহকদের Online Banking সুবিধা দেয়া হচ্ছে।
  ব্যাংকের নিজস্ব ATM স্থাপনঃ ডেবিট কার্ড ও ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করে ১০৫ টি নিজস্ব এবং অন্যান্য ব্যাংকের ১৯৮৫ টি Automated Teller Machine (ATM) এর মাধ্যমে গ্রাহকদের ২৪ ঘন্টা সেবা প্রদান করা হচ্ছে।
 

নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক পরিবেশ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নঃ নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক পরিবেশ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করে পরিবেশের উপর প্রভাব বিস্তারকারী সংবেদনশীল বিভিন্ন খাত যেমন- কৃষি/কৃষি খামার, কৃষি ব্যবসা (পোলট্রি ও ডেইরি), মৎস্য, চামড়া (ট্যানারী), বস্ত্র ও পোষাক শিল্প, মন্ড ও কাগজ শিল্প,  ধাতব ও প্রকৌশল শিল্প, চিনি ও চিনি উপজাত শিল্প, রাবার ও প্ল্যাস্টিক শিল্প, নির্মাণ ও গৃহায়ণ শিল্প, রাসায়নিক শিল্প (ফার্টিলাইজার, পেস্টিসাইডস ও ফার্মাসিউটিক্যালস্), হাসপাতাল /ক্লিনিক/ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ব্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং, জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প, পাট ও পাটজাত পণ্য উৎপাদন শিল্প ইত্যাদির জন্য নির্দিষ্ট খাত ভিত্তিক পরিবেশ সংক্রান্ত নীতিমালা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

 

গ্রিন স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং প্রণয়নঃ গ্রিন স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং প্রণয়ন করে ব্যাংকের সর্বস্তরে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে    ই-মেইলের মাধ্যমে অবহিত করা হয়েছে ।

  পরিবেশ আইনের সাথে সংগতি রেখে ব্যাংকার, গ্রাহক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং পরিবেশ রক্ষার কাজে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করার জন্য প্রেষণা সৃষ্টির লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকলকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। গ্রিন ব্যাংকিং বিষয়ে ব্যাংকের স্টাফ কলেজ ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউট সমূহে প্রশিক্ষণ/কর্মশালা চলমান রয়েছে।
  সময় ও অর্থের সাশ্রয় এবং কাগজবিহীন ব্যাংকিং চালুকরণের নিমিত্ত সার্কুলার ইস্যুকরণসহ যাবতীয় পত্রযোগাযোগ ব্যাংকের ওয়েবসাইট ও ই-মেইলের মাধ্যমে সম্পাদনের লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
 

প্রতি ত্রৈমাসিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ফরম্যাটে এ ব্যাংকের গ্রিন ব্যাংকিং কার্যাবলীর তথ্য নিয়মিত তাদের নিকট রিপোর্ট করা হচ্ছে।

 

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী এ ব্যাংকের বিদ্যমান CSR সেল এবং গ্রিন ব্যাংকিং ইউনিট অবলুপ্ত করে রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনের অধীনে একটি স্বতন্ত্র ‘‘সাসটেইনবল ফাইন্যান্স ইউনিট’’ গঠন করা হয়েছে।